ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তাঁর পিতা আলী খামেনির মৃত্যুর পর গত মার্চ মাসে ক্ষমতা গ্রহণ করলেও এখন পর্যন্ত জনসমক্ষে উপস্থিত হননি। তাঁর এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি এবং অজ্ঞাত স্থান থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়টি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক রহস্যের জন্ম দিয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, এর পেছনে শারীরিক সক্ষমতা হ্রাস এবং কঠোর নিরাপত্তা কৌশল—উভয় কারণই সমানভাবে কাজ করছে।
শারীরিক আঘাতের গভীরতাঃ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় আলী খামেনি নিহত হওয়ার সময় ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা নিজেও গুরুতর আহত হয়েছিলেন বলে জানা গেছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক এক রিপোর্ট অনুযায়ী:
- হামলায় তাঁর মুখমণ্ডল ও ঠোঁট ভয়াবহভাবে দগ্ধ হয়েছে, যার ফলে তাঁর কথা বলা বর্তমানে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।
- এক পায়ে তিনটি অস্ত্রোপচার করা হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি কৃত্রিম পা (prosthetic leg) লাগানোর অপেক্ষায় আছেন।
- একটি হাতও জখম হয়েছিল, যা বর্তমানে ধীরে ধীরে সচল হচ্ছে।
- এমনকি তাঁর অবস্থা এতটাই সংকীর্ণ ছিল যে, তিনি কমার (unconscious) পর্যায়ে ছিলেন বলেও কোনো কোনো গোয়েন্দা নথিতে দাবি করা হয়েছে।
অজ্ঞাত স্থান থেকে শাসন: অভিনব কৌশলঃ
শারীরিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি নিরাপত্তার খাতিরেও মোজতবা নিজেকে আড়ালে রেখেছেন। ইসরায়েলি গুপ্তহত্যার হাত থেকে বাঁচতে তিনি বর্তমানে তেহরানের বাইরে কোনো এক নিরাপদ বাংকারে বা পবিত্র নগরী কোমে অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁর শাসন পদ্ধতির কিছু বৈশিষ্ট্য হলো:
- হিউম্যান চেইন ও হাতে লেখা চিরকুট: আধুনিক ট্র্যাকিং প্রযুক্তি এড়াতে তিনি কোনো ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করছেন না। পরিবর্তে 'হিউম্যান চেইন' বা বিশ্বস্ত দূতদের মাধ্যমে হাতে লেখা চিরকুটে সরাসরি নির্দেশ পাঠাচ্ছেন।
- বোর্ড মেম্বার স্টাইল: তিনি দেশ চালাচ্ছেন অনেকটা একটি 'কোম্পানি বোর্ডের' চেয়ারম্যানের মতো। সেখানে রিভোলিউশনারি গার্ডসের (IRGC) জেনারেলরা বোর্ডের সদস্য হিসেবে কাজ করছেন এবং যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
- ভয়েস কনফারেন্সিং: গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক বৈঠকগুলোতে তিনি সরাসরি উপস্থিত না থেকে মাঝে মাঝে অডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অংশ নিচ্ছেন।
জনমনে রহস্য ও বিক্ষোভঃ
মোজতবার এই আড়ালে থাকা শাসকের ইমেজকে সাধারণ ইরানীদের মধ্যে অনেকেই 'দুর্বলতা' হিসেবে দেখছেন। ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর অনুপস্থিতি নিয়ে বিদ্রূপ শুরু হয়েছে এবং তেহরানের বিভিন্ন স্থানে তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষিপ্ত প্রতিবাদ ও "ডেথ টু মোজতবা" স্লোগান শোনা গেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোজতবা খামেনি যতক্ষণ না সুস্থ হয়ে কোনো ভিডিও বার্তার মাধ্যমে জাতির সামনে আসছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে তাঁর অবস্থান এবং শারীরিক অবস্থা নিয়ে জল্পনা চলতেই থাকবে।